Ticker

6/recent/ticker-posts

শবে কদরের নামাজের নিয়ম, নিয়ত, দোয়া, গুরুত্ব ও ফজিলত

শবে কদরের নামাজের নিয়ম, নিয়ত, দোয়া, গুরুত্ব ও ফজিলত
শবে কদরের নামাজের নিয়ম, নিয়ত, দোয়া, গুরুত্ব ও ফজিলত

মুসলমানদের কাছে বরকতময় মাস রমজান আর এই রমজান মাসের একটি রাতকে আল্লাহ তায়ালা অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ করেছেন যে রাতকে আমরা শবে কদরের রাত হিসেবে জানি। শবে কদর ফারাসি  শব্দ। যার অর্থ হলো বরকতময়, সম্মানিত ও মহিমান্বিত রাত। শবে কদরের রাতে মুসলমানরা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য সারা রাত নফল নামাজ, কোরআন ও হাদিসের আলোকে জিকির, কবর জিয়ারত এবং নিজের কৃত গুনাহার জন্য মহান আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে থাকেন। হাজার মাসের ইবাদতের চেয়েও এ রাতের ইবাদাত অনেক উত্তম। এই রাতে আল্লাহ তায়ালার অশেষ নিয়ামত ও রহমত বর্ষিত হয়।

এই শবে কদরের রাতেই মহানবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ) নিকট সর্বপ্রথম কোরআন নাজিল হয়, এজন্য এই রাতকে আরো বেশি তাৎপর্যপূর্ণ করেছে। এই রাতে জিবরাঈল আঃ ও ফেরেশতারা পৃথীবিতে অবতরণ করেন এবং যত নারী-পুরুষ নামাজ পড়া, কোরআন পড়া অথবা জিকিরে মশগুল থাকে তাদের জন্য দোয়া করে থাকেন। ( মাযহারি )

আমাদের সমাজে শবে কদর ২৭ রমজানে পালন করা হলেও, ইসলাম শরিয়তের বিধান অনুযায়ী রমজান মাসে শেষ দশকের বিজোড় রাতে শবে কদর অনুসন্ধানের নির্দেশ দেওয়া আছে। এই রাতটি পাওয়ার জন্য রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমজানের শেষ দশকে ইবাদতের নিয়তে মসজিদে ইতেকাফে অতিবাহিত করতেন।


শবে কদরের নামাজের নিয়ম ঃ 

শবে কদরে নামাজে বিশেষ কোনো নামাজের নিয়ম বা পদ্ধতি নেই। শবে কদরের রাতে দুই রাকাত করে নফল নামাজ যত সুন্দর ও মনোযোগ সহকারে পড়া যায় তত বেশি সওয়াব। দুই রাকাত, দুই রাকাত করে আপনি যত খুশি তত পড়তে পারবেন। নামাজের প্রতি রাকাতে সূরা ফাতিহা পড়ার পর সূরা ইখলাস, সূরা ক্কদর, আয়াতুল কুরসি বা সূরা তাকাছুর ইত্যাদি মিলিয়ে পড়া অধিক সওয়াব কাজ। এই ভাবে কমপক্ষে ১২ রাকাত নামাজ আদায় করা উওম। তবে আপনি যত বেশি নামাজ আদায় করবেন তত বেশি সওয়াব পাওয়া যায়।


শবে কদরের নামাজের নিয়ত ঃ 

আরবি:  نَوَيْتُ اَنْ اُصَلِّىَ لِلَّهِ تَعَا لَى رَكْعَتِ صَلَوةِالْنَفْلِ مُتَوَجِّهًا اِلَى جِهَةِ الْكَعْبَةِ الشَّرِ يْفَةِ اَللَّهُ اَكْبَرُ

‘নাওয়াইতু আন উছাল্লিয়া লিল্লাহি তায়া'লা  রাকআ'তাই  ছালাতি লাইলাতিল কদ্র-নাফালি, মুতাওয়াজ্জিহান ইলা-জিহাতিল্‌ কা’বাতিশ্‌ শারীফাতি আল্লাহু আকবার। ’

অর্থ: আমি কেবলামুখী হয়ে আল্লাহর (সন্তুষ্টির) জন্য শবে কদরের দুই কদরের দুই রাকাত নফল নামাজ পড়ার নিয়ত করলাম, আল্লাহু আকবর।


শবে কদরের নামাজের দোয়া ঃ 

নামাজ শেষে এই দোয়াটি কমপক্ষে ১০০ বার পড়া উত্তম। দোয়াটি হলো ‘সুব্‌হানাল্লাহি ওয়ালা হাম্‌দু লিল্লাহি ওয়া লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবার, লা হা’ওলা কুয়্যাতা ইল্লাবিল্লাহিল্‌ আলীয়্যিল আযীম।’


এই রাতে যে দোয়াটি বেশি করে পড়বেন ঃ 

হজরত আয়েশা সিদ্দিকা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘ইয়া রাসূলাল্লাহ, শবে কদরের রাতে আমার কোন দোয়াটি পড়া উচিত? ' তিনি তাকে যে দোয়াটি পড়ার নির্দেশ দিলেন: ‘আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আফুউন তুহিব্বুল আফওয়া ফাফু আন্নি।’ অর্থাৎ, ‘হে আল্লাহ! আপনি ক্ষমাশীল এবং ক্ষমা করতে ভালোবাসেন, তাই আমাকে ক্ষমা করুন।’ (সুনানে ইবনে মাজা)


লাইলাতুল কদরের গুরুত্ব ও ফজিলত ঃ

পবিত্র কোরআন ও সহীহ-হাদিস দ্বারা লাইলাতুল কদরের গুরুত্ব প্রতিষ্ঠিত করা হয়ছে। শবে বরাত নিয়ে এবং শব-ই-বরাতের হাদিস গুলোর বর্ণ্না নিয়ে হাদিস বিশেষজ্ঞ ও ফকিহেদর মধ্যে, যে সংশয় রয়েছে-লাইলাতুল কদরের ব্যাপারে তাঁর কোনো অবকাশ নেই। পবিত্র কোরআন, নির্ভরযোগ্য হাদিস এবং রাসূলুল্লাহ সাঃ-এর লাইলাতুল কদরের জন্য গৃহীত কর্মতৎপরতা লাইলাতুল কদরের গুরুত্ব বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।

এ সম্মানিত রজনীর গুরুত্ব সম্পর্কে মহান আল্লাহ বলেন,‘আমি এ (কোরআনকে) কদরের রাতে নাজিল করেছি। তুমি কি জানো, কদরের রাত কী ? কদরের রাত হলো হাজার মাস হতেও উত্তম-কল্যাণময় রাত ’(সূরা আল কদর :১-৩)। এ রাতটি কোন মাসে ?

এ ব্যাপারে মহান আল্লাহ বলেন, ‘রমজান হচ্ছে এমন একটি মাস যে মাসে কুরআন নাযিল হয়েছে - ’(বাকারা : ১৮৫)। এই রাতটি রমজান মাসে কোন তারিখে? রাসূলুল্লাহ সাঃ একটি রহস্যময় কারণে তারিখটি সুনির্দিষ্ট করেন নি। ইমাম বুখারি, ইমাম মুসলিম, ইমাম আহমদ ও তিরমিযী কর্তৃক বর্ণিত হাদিসে বলা হয়েছে, হজরত আয়েশা (রা:) বর্ণনা করেছেন, নবী করীম (সা:) বলেছেন, ‘কদরের রাতকে রমজানের শেষ দশ রাতের মধ্যে কোন বিজোড় রাতকে খোঁজ করো ’।

এ রাতের আরো একটি গুরুত্ব হল এ পবিত্র রাতেই কোরআন নাযিল করা হয়েছে। আর কোরআনের সাথেই মানুষের ভাগ্য জড়িয়ে আছে। এজন্য কদরের আর একটি অর্থ হল- ভাগ্য। তাহলে লাইলাতুল কদরের অর্থ হলো - ভাগ্য রজনী। যে মানুষ, যে সমাজ, যে জাতি, কোরআনকে বাস্তব জীবন বিধান হিসেবে গ্রহণ করবে তারা পার্থিব জীবনে ও পরকালীন জীবনে সম্মানীত হবে। এ রাতে নাযিলকৃত কোরআনকে যারা অবহেলা করবে তাঁরা ইতিহাসের আস্তাকুড়ে নিক্ষিপ্ত হবে। এ রাতেই মানব কল্যাণে আল্লাহ মানুষের জন্য চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ফেরেস্তাদের জানান। আল্লাহ বলেন- ‘এ রাতে প্রত্যেকটি ব্যাপারে অত্যন্ত বিজ্ঞানসম্মত ও সুদৃঢ় ফায়সালা জারি করা হয়।’(সূরা দুখান : ৪)


শবে কদরের নামাজ কত রাকাত ঃ 

শবে কদরের নামাজ বলতে নির্দিষ্ট কোন নামাজ নাই। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং সাহাবায়ে কেরাম, কেউ কোন নামাজ নির্ধারিত করা যাই নাই। কিন্তু শবে কদরের ইবাদাত যেহেতু নফল ইবাদাত। এজন্য আপনারা নফল নামাজের প্রতি মনোযোগী হতে পারেন। কেননা নামাজের মাধ্যমেই আল্লাহ তাআলার সাথে বান্দার গভীর সম্পর্ক স্থাপিত হয়। যা অন্য কোন ইবাদাতে হতে পারে না। 

আর নফল নামাজের নির্ধারিত কোন বিশেষ নিয়ত বা নিয়ম নেই। অন্য সকল নামাজের মতই এই নামাজ একইভাবে নিয়ত করে আদায় করতে হয়। এ ব্যাপারে ইসলামী স্কলারগণ একমত।


শবে কদরের আমল ঃ 

১. কোরআনুল কারীম তেলাওয়াত ।   

পবিত্র কুরআন শুদ্ধভাবে ও নিয়ম করে পড়ে খতমের চেষ্টা করা। বিশেষ করে সূরা ইয়াসিন, সূরা আর রহমান, সূরা ওয়াকিয়া, সূরা মূলক, সূরা কাহাফ, সূরা হা-মীম সেজদা, সূরা দুখান পাঠ করা। পবিত্র কুরআন পড়তে না পারলে কারো কাছ থেকে কুরআন পড়া শোনা। এটাও সম্ভব না হলে ইখলাস বেশি বেশি করে পাঠ করুন। 

২. জিকির করা । 

১. সুবহানাল্লাহ ।                   ২. আলহামদুলিল্লাহ ।  
৩. লা-ইলাহা ইল্লালাহ ।        ৪, আল্লাহু আকবার ।     ৫. সুবহানাল্লাহি ওবিহামদিহি । 

এই ধরণের জিকিরগুলো বেশি বেশি করে পড়তে পারেন।

৩. ইস্তেগফার পড়া । 

বিভিন্ন রকম ইস্তেগফার আছে। সংক্ষেপে দু-একটি দেখুন-

১. ইস্তেগফার 

اَللّٰهُمَّ اَنْتَ رَبِّيْ لَاۤ اِلٰهَ اِلَّاۤ اَنْتَ. خَلَقْتَنِيْ وَاَنَا عَبْدُكَ. وَاَنَا عَلٰى عَهْدِكَ وَوَعْدِكَ مَا اسْتَطَعْتُ. اَعُوْذُ بِكَ مِنْ شَرِّ مَا صَنَعْتُ اَبُوْءُ لَكَ بِنِعْمَتِكَ عَلَيَّ. وَاَبُوْءُ بِذَنْبِيْ فَاغْفِرْ لِيْ فَاِنَّهٗ لَا يَغْفِرُ الذُّنُوْبَ اِلَّاۤ اَنْتَ.

অর্থঃ হে আল্লাহ! তুমিই আমার প্রতিপালক, তুমি ব্যতীত অন্য কোন মাবুদ নেই। তুমিই আমার স্রষ্টা এবং আমি তোমার বান্দা। আমি তোমার সাথে কৃত ওয়াদা ও অঙ্গীকারের উপর সাধ্যানুযায়ী অটল ও অবিচল আছি। আমি আমার সকল মন্দ কৃতকর্মের অনিষ্ট হতে তোমার আশ্রয় প্রার্থনা করছি। আমার প্রতি তোমার অনুগ্রহের কথা স্বীকার করছি এবং আমার গুনাহের কথাও স্বীকার করছি। হে আল্লাহ তুমি আমাকে ক্ষমা করো, কেননা তুমি ছাড়া আর কেউ গুনাহ ক্ষমা করতে পারে না। (সহীহ বুখারী, হাদীস নং : ৬৩০৬)

২. ইস্তিগফার 

اَسْتَغْفِرُ اللهَ رَبِّيْ مِنْ كُلِّ ذَنْبٍ وَّاَ تُوْبُ اِلَيْهِ.

অর্থঃ আমি আমার রবের নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করছি, সর্বপ্রকার গুনাহ থেকে এবং তাঁর নিকট তওবা করছি। (আউনুল মাবুদ)

৩. ইস্তিগফার 

اَللّٰهُمَّ اغْفِرْلِيْ. وَارْحَمْنـِـيْ. اَسْتَغْفِرُ اللهَ. اَسْتَغْفِرُ اللهَ. اَسْتَغْفِرُ اللهَ

অর্থঃ হে আল্লাহ আমাকে ক্ষমা করো এবং আমার প্রতি দয়া করো। আমি আল্লাহর নিকট ক্ষমা চাই, আল্লাহর নিকট ক্ষমা চাই, আল্লাহর নিকট ক্ষমা চাই। 

উল্লেখিত তিনটি ইস্তেগফার ছাড়াও আরো অসংখ্য ইস্তেগফার রয়েছে। যার কাছে যেটা সহজ মনে হয়, সে সেটা বেশি করে পাঠ করতে পারেন।

৪. বেশি বেশি দু'আ করা । 

ইবাদাতের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইবাদাত হলো নামাজের আদায়ের পর দু'আ করা। অন্য হাদিসে ডাকে সমস্ত ইবাদতের মূল বলা হয়েছে। তাই এই রাতে দু'আ করে, আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রর্থনা করা এবং মনের ইচ্ছা সবকিছু চেয়ে নেওয়া প্রয়োজন। দোয়া আরবি , বাংলা অথবা নিজস্ব ভাষায় নিজের মতো করে করা যায়। ‘কোরআনে বর্ণিত কয়েকটি দোয়া ’

আল্লাহর রহমত কামনার জন্য পড়ুন-

শবে কদরের মোনাজাত- 

رَبَّنَا لَا تُؤَاخِذْنَا إِنْ نَسِينَا أَوْ أَخْطَأْنَا رَبَّنَا وَلَا تَحْمِلْ عَلَيْنَا إِصْرًا كَمَا حَمَلْتَهُ عَلَى الَّذِينَ مِنْ قَبْلِنَا رَبَّنَا وَلَا تُحَمِّلْنَا مَا لَا طَاقَةَ لَنَا بِهِ وَاعْفُ عَنَّا وَاغْفِرْ لَنَا وَارْحَمْنَا أَنْتَ مَوْلَانَا فَانْصُرْنَا عَلَى الْقَوْمِ الْكَافِرِينَ.

অর্থঃ হে আমাদের পালনকর্তা, যদি আমরা ভুল যাই কিংবা ভুল করি, তবে আমাদেরকে অপরাধী করো না। হে আমাদের পালনকর্তা ! এবং আমাদের উপর এমন দায়িত্ব অর্পণ করো না, যেমন আমাদের পূর্ববর্তীদের উপর অর্পণ করেছো। হে আমাদের প্রভু! এবং আমাদের দ্বারা ঐ বোঝা বহন করিও না, যা বহন করার শক্তি আমাদের নাই। আমাদের পাপ মোচন করো। আমাদেরকে ক্ষমা করো এবং আমাদের প্রতি দয়া করো। তুমিই আমাদের প্রভু। সুতরাং, কাফের সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে আমাদেরকে সাহায্য করো।( সূরা বাকারাহ : আয়াত নং, ২৮৬ ) 

৫. দুরূদে শরীফ পাঠ করা । 

১. দুরূদে ইবরাহীম 

اَللّٰهُمَّ صَلِّ عَلٰى مُحَمَّدٍ. وَّعَلٰى اٰلِ مُحَمَّدٍ كَمَا صَلَّيْتَ عَلٰى اِبْرَاهِيْمَ وَعَلٰى اٰلِ اِبْرَاهِيْمَ’ اِنَّكَ حَمِيْدٌ مَّجِيْدٌ. اَللّٰهُمَّ بَارِكْ عَلٰى مُحَمَّدٍ. وَّعَلٰى اٰلِ مُحَمَّدٍ كَمَا بَارَكْتَ عَلٰى اِبْرَاهِيْمَ وَعَلٰى اٰلِ اِبْرَاهِيْمَ. اِنَّكَ حَمِيْدٌ مَّجِيْدٌ.

অর্থঃ হে আল্লাহ! তুমি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও তাঁর বংশধরের প্রতি রহমত নাযিল করো, যেমন রহমত নাযিল করেছিলে ইবরাহীম আলাইহিস সালাম ও তাঁর বংশধরের প্রতি। নিশ্চয় তুমি প্রশংসানীয় ও মর্যাদাবান। (সহীহ বুখারী : হাদীস নং, ৩৩৭০)


তারাবির নামাজের নিয়ম কানুন ও নিয়ত

Post a Comment

0 Comments